সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

 

সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর)


সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যায়।


মানুষের ভেঙে পড়ারও শব্দ হয়।


তবে সেই শব্দ সবাই শুনতে পায় না।


একসময় তার দিন শুরু হতো "সুপ্রভাত" দিয়ে, আর শেষ হতো "ঘুমিয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে"—এই কথাগুলো দিয়ে। এখনো দিন শুরু হয়, রাতও শেষ হয়; শুধু কথাগুলো আর আগের মতো আসে না।


সময়ের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে।


সে মানুষকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতিগুলোকে আরও কাছে এনে বসিয়ে রাখে।


২০২৫ সালের ঈদের আগের কথা।


সেদিন ময়না খুব খুশি ছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে সে বলছিল, ঈদে কী করবে, কী পরবে। সামির শুধু শুনছিল। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় কাজ বোধহয় তার পছন্দের মানুষের কথা শোনা।


সন্ধ্যার পর হঠাৎ একটি ছবি এলো।


হাতভর্তি মেহেদি।


সামির অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।


পৃথিবীতে কিছু দৃশ্য আছে, যেগুলো মানুষ চোখ দিয়ে দেখে না—হৃদয় দিয়ে দেখে।


সেদিন সে প্রথমবার উপলব্ধি করেছিল, ভালোবাসা আসলে কাউকে কাছে পাওয়ার নাম নয়; ভালোবাসা হলো দূরে থেকেও তার ছোট ছোট আনন্দে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার নাম।


সে মজা করে লিখেছিল,


— "ময়না, তোমার হাতে মেহেদি খুব সুন্দর লাগছে।"


উত্তরে শুধু একটি হাসির চিহ্ন এসেছিল।


সামির জানত না, একদিন সেই হাসির চিহ্নটাকেও সে এতটা মিস করবে।


সময় এগিয়ে যেতে লাগল।


এরই মাঝে বহুবার ঝগড়া হয়েছে।


বহুবার অভিমান হয়েছে।


বহুবার এমন হয়েছে, তারা ভেবেছে—এবার বুঝি সত্যিই সব শেষ।


কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রতিবারই তারা ফিরে এসেছে।


কখনো একটি মেসেজে।


কখনো একটি ক্ষমা চাওয়ায়।


কখনো বা শুধুই নীরবতায়।


সামির প্রায়ই ভাবত, "মানুষ যদি কাউকে ভালো না-ই বাসে, তাহলে এতবার ফিরে আসে কেন?"


এই প্রশ্নের উত্তর সে আজও খুঁজে পায়নি।


একদিন গভীর রাতে, যখন চারপাশে সবকিছু নিস্তব্ধ, সাবিহা খুব আস্তে করে বলেছিল,


— "শোনো, যদি কোনোদিন আমি তোমার না হই?"


সামির অনেকক্ষণ কিছু বলেনি।


তারপর লিখেছিল,


— "আমি আল্লাহর কাছে এমন কোনো ভবিষ্যৎ চাইনি, যেখানে তুমি নেই।"


ওপাশে আর কোনো উত্তর আসেনি।


কিছু নীরবতা আছে, যেগুলো শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলে।


সামির তখন নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ত।


প্রতিটি সিজদায় একই নাম।


প্রতিটি দোয়ায় একই মানুষ।


মানুষ নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের চাওয়া বদলে ফেলে।


কিন্তু সামির পারেনি।


তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্থিরতা ছিল—একজন মানুষ।


মাঝেমধ্যে সে ভাবত, আল্লাহ কি ক্লান্ত হয়ে যান একই দোয়া বারবার শুনতে শুনতে?


তারপর নিজেই নিজেকে বলত, "না, আল্লাহ তো বান্দার কান্নায় ক্লান্ত হন না।"


তার দোয়াটা খুব সাধারণ ছিল—


"হে আল্লাহ, যদি সে আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে পৃথিবীর সব দরজা খুলে দিন। আর যদি না হয়, তাহলে তাকে ভুলে যাওয়ার শক্তি দিন।"


অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রথম অংশের উত্তর সে আজও পায়নি।


আর দ্বিতীয় অংশের শক্তিটাও পায়নি।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফোন বদলে গেছে।


নম্বর বদলে গেছে।


অনেক কিছু বদলে গেছে।


শুধু বদলায়নি একটি জিনিস।


সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ।


আজ আর সেই রেকর্ডিংটি নেই।


হয়তো কোনো পুরোনো ফোনের মেমোরির সঙ্গে হারিয়ে গেছে।


কিন্তু সামির মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে, একটি রেকর্ডিং হারিয়ে যেতে পারে, অথচ তার প্রতিটি শব্দ কীভাবে মানুষের স্মৃতিতে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে?


আজও কখনো কখনো গভীর রাতে তার মনে হয়, কেউ যেন খুব আস্তে করে পড়ছে—


"ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান..."


তখন সে চোখ বন্ধ করে।


আর মনে মনে বলে, "ময়না, তুমি কি এখনো আমাকে মনে রেখেছ?"


তার কোনো উত্তর আসে না।


শুধু রাত আরও গভীর হয়।


আর নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে।


এর মাঝেই চলে আসে ৮ অক্টোবর।


ময়নার জন্মদিন।


মানুষের জীবনে কিছু তারিখ থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে না; সেগুলো লেখা থাকে হৃদয়ে।


সামির কখনো এই তারিখটা ভুলতে পারেনি।


সে জানে না, ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোথায় থাকবে।


সে জানে না, জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে তার পাশে কে থাকবে।


কিন্তু সে এটুকু জানে, প্রতি বছর ৮ অক্টোবর এলে তার মনে একজন মানুষের কথা অবশ্যই মনে পড়বে।


কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে এসে চলে যায় না।


তারা থেকে যায়।


দোয়া হয়ে।


অপেক্ষা হয়ে।


আর কখনো কখনো—


একটি অসমাপ্ত সূরা হয়ে।


সামিরের এখন সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়।


তার সবচেয়ে বড় ভয়, কোনো একদিন হঠাৎ করে শুনতে হবে—


"ময়নার বিয়ে হয়ে গেছে।"


এই একটি বাক্য তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়।


তবুও সে অপেক্ষা করে।


কারণ ভালোবাসা তাকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে।


আর আল্লাহ তাকে আশা করতে শিখিয়েছেন।


তাই আজও, প্রতিটি তাহাজ্জুদের শেষে, প্রতিটি নীরব রাতের শেষে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের শেষে সে শুধু একটি কথাই বলে—


"হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, তাহলে অসমাপ্ত গল্পগুলোও একদিন পূর্ণতা পায়।"

No comments:

Post a Comment

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

  সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ (চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর) সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থা...