সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

 

সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর)


সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যায়।


মানুষের ভেঙে পড়ারও শব্দ হয়।


তবে সেই শব্দ সবাই শুনতে পায় না।


একসময় তার দিন শুরু হতো "সুপ্রভাত" দিয়ে, আর শেষ হতো "ঘুমিয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে"—এই কথাগুলো দিয়ে। এখনো দিন শুরু হয়, রাতও শেষ হয়; শুধু কথাগুলো আর আগের মতো আসে না।


সময়ের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে।


সে মানুষকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতিগুলোকে আরও কাছে এনে বসিয়ে রাখে।


২০২৫ সালের ঈদের আগের কথা।


সেদিন ময়না খুব খুশি ছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে সে বলছিল, ঈদে কী করবে, কী পরবে। সামির শুধু শুনছিল। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় কাজ বোধহয় তার পছন্দের মানুষের কথা শোনা।


সন্ধ্যার পর হঠাৎ একটি ছবি এলো।


হাতভর্তি মেহেদি।


সামির অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।


পৃথিবীতে কিছু দৃশ্য আছে, যেগুলো মানুষ চোখ দিয়ে দেখে না—হৃদয় দিয়ে দেখে।


সেদিন সে প্রথমবার উপলব্ধি করেছিল, ভালোবাসা আসলে কাউকে কাছে পাওয়ার নাম নয়; ভালোবাসা হলো দূরে থেকেও তার ছোট ছোট আনন্দে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার নাম।


সে মজা করে লিখেছিল,


— "ময়না, তোমার হাতে মেহেদি খুব সুন্দর লাগছে।"


উত্তরে শুধু একটি হাসির চিহ্ন এসেছিল।


সামির জানত না, একদিন সেই হাসির চিহ্নটাকেও সে এতটা মিস করবে।


সময় এগিয়ে যেতে লাগল।


এরই মাঝে বহুবার ঝগড়া হয়েছে।


বহুবার অভিমান হয়েছে।


বহুবার এমন হয়েছে, তারা ভেবেছে—এবার বুঝি সত্যিই সব শেষ।


কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রতিবারই তারা ফিরে এসেছে।


কখনো একটি মেসেজে।


কখনো একটি ক্ষমা চাওয়ায়।


কখনো বা শুধুই নীরবতায়।


সামির প্রায়ই ভাবত, "মানুষ যদি কাউকে ভালো না-ই বাসে, তাহলে এতবার ফিরে আসে কেন?"


এই প্রশ্নের উত্তর সে আজও খুঁজে পায়নি।


একদিন গভীর রাতে, যখন চারপাশে সবকিছু নিস্তব্ধ, সাবিহা খুব আস্তে করে বলেছিল,


— "শোনো, যদি কোনোদিন আমি তোমার না হই?"


সামির অনেকক্ষণ কিছু বলেনি।


তারপর লিখেছিল,


— "আমি আল্লাহর কাছে এমন কোনো ভবিষ্যৎ চাইনি, যেখানে তুমি নেই।"


ওপাশে আর কোনো উত্তর আসেনি।


কিছু নীরবতা আছে, যেগুলো শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলে।


সামির তখন নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ত।


প্রতিটি সিজদায় একই নাম।


প্রতিটি দোয়ায় একই মানুষ।


মানুষ নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের চাওয়া বদলে ফেলে।


কিন্তু সামির পারেনি।


তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্থিরতা ছিল—একজন মানুষ।


মাঝেমধ্যে সে ভাবত, আল্লাহ কি ক্লান্ত হয়ে যান একই দোয়া বারবার শুনতে শুনতে?


তারপর নিজেই নিজেকে বলত, "না, আল্লাহ তো বান্দার কান্নায় ক্লান্ত হন না।"


তার দোয়াটা খুব সাধারণ ছিল—


"হে আল্লাহ, যদি সে আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে পৃথিবীর সব দরজা খুলে দিন। আর যদি না হয়, তাহলে তাকে ভুলে যাওয়ার শক্তি দিন।"


অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রথম অংশের উত্তর সে আজও পায়নি।


আর দ্বিতীয় অংশের শক্তিটাও পায়নি।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফোন বদলে গেছে।


নম্বর বদলে গেছে।


অনেক কিছু বদলে গেছে।


শুধু বদলায়নি একটি জিনিস।


সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ।


আজ আর সেই রেকর্ডিংটি নেই।


হয়তো কোনো পুরোনো ফোনের মেমোরির সঙ্গে হারিয়ে গেছে।


কিন্তু সামির মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে, একটি রেকর্ডিং হারিয়ে যেতে পারে, অথচ তার প্রতিটি শব্দ কীভাবে মানুষের স্মৃতিতে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে?


আজও কখনো কখনো গভীর রাতে তার মনে হয়, কেউ যেন খুব আস্তে করে পড়ছে—


"ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান..."


তখন সে চোখ বন্ধ করে।


আর মনে মনে বলে, "ময়না, তুমি কি এখনো আমাকে মনে রেখেছ?"


তার কোনো উত্তর আসে না।


শুধু রাত আরও গভীর হয়।


আর নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে।


এর মাঝেই চলে আসে ৮ অক্টোবর।


ময়নার জন্মদিন।


মানুষের জীবনে কিছু তারিখ থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে না; সেগুলো লেখা থাকে হৃদয়ে।


সামির কখনো এই তারিখটা ভুলতে পারেনি।


সে জানে না, ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোথায় থাকবে।


সে জানে না, জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে তার পাশে কে থাকবে।


কিন্তু সে এটুকু জানে, প্রতি বছর ৮ অক্টোবর এলে তার মনে একজন মানুষের কথা অবশ্যই মনে পড়বে।


কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে এসে চলে যায় না।


তারা থেকে যায়।


দোয়া হয়ে।


অপেক্ষা হয়ে।


আর কখনো কখনো—


একটি অসমাপ্ত সূরা হয়ে।


সামিরের এখন সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়।


তার সবচেয়ে বড় ভয়, কোনো একদিন হঠাৎ করে শুনতে হবে—


"ময়নার বিয়ে হয়ে গেছে।"


এই একটি বাক্য তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়।


তবুও সে অপেক্ষা করে।


কারণ ভালোবাসা তাকে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে।


আর আল্লাহ তাকে আশা করতে শিখিয়েছেন।


তাই আজও, প্রতিটি তাহাজ্জুদের শেষে, প্রতিটি নীরব রাতের শেষে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের শেষে সে শুধু একটি কথাই বলে—


"হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, তাহলে অসমাপ্ত গল্পগুলোও একদিন পূর্ণতা পায়।"

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - তৃতীয় খণ্ড

 

সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(তৃতীয় খণ্ড: সন্দেহের ঋতু)


মানুষ যখন খুব বেশি ভালোবেসে ফেলে, তখন তার ভেতরে দু'টি জিনিস জন্ম নেয়—ভয় এবং অধিকারবোধ।


ভালোবাসার শুরুতে মানুষ শুধু হাসতে শেখে। কিন্তু ভালোবাসা যত গভীর হয়, ততই সে হারানোর ভয় পেতে শুরু করে। আর এই ভয়টাই একসময় সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেও অপরিচিত করে দিতে পারে।


সামিরের ক্ষেত্রেও হয়েছিল ঠিক তাই।


যে মানুষটা একদিন সূরা রহমানের তেলাওয়াতে তার রাতগুলোকে সুন্দর করে তুলেছিল, সেই মানুষটিকে হারানোর ভয় ধীরে ধীরে তাকে বদলে দিতে শুরু করল।


শুরুর দিকে বিষয়গুলো খুব ছোট ছিল।


"আজ এত দেরি করে উত্তর দিলে কেন?"


"তুমি কি ব্যস্ত ছিলে?"


"তোমার মন খারাপ?"


এই প্রশ্নগুলো একসময় বদলে গেল।


"কার সঙ্গে কথা বলছিলে?"


"আমাকে কিছু লুকাচ্ছো না তো?"


"তুমি কি আগের মতো আছো?"


সাবিহা প্রথমে বুঝতে পারত না।


সে অবাক হয়ে বলত, "তুমি এত ভাবো কেন?"


সামির উত্তর দিত না।


সে কীভাবে বোঝাবে, যে মানুষটাকে সে নিজের প্রতিটি দোয়ার শেষে চায়, তাকে হারানোর চিন্তাটাই তার সবচেয়ে বড় ভয়?


কিন্তু ভয় কখনো কখনো মানুষের বিচারবুদ্ধির চেয়েও বড় হয়ে যায়।


একদিন রাত প্রায় দু'টো।


অনেকক্ষণ ধরে তাদের কথা হচ্ছিল না।


সামিরের মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বদলে গেছে।


মানুষের মন বড় অদ্ভুত। কোনো প্রমাণ ছাড়াই সে হাজারটা গল্প তৈরি করে ফেলতে পারে।


সেই রাতে সামির এমন কিছু কথা বলেছিল, যেগুলো তার বলা উচিত ছিল না।


সাবিহা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।


তারপর খুব শান্ত গলায় বলেছিল,


— "তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?"


সামির উত্তর দিতে পারেনি।


কারণ সত্যিটা ছিল, সে বিশ্বাস করত। কিন্তু সে ভয়ও পেত।


আর ভালোবাসার ভেতর যখন ভয় ঢুকে পড়ে, তখন বিশ্বাসও ধীরে ধীরে আহত হতে শুরু করে।


সেই রাতেই প্রথম বড় ঝগড়া হয়েছিল।


সাবিহা শুধু একটি কথাই বারবার বলছিল,


— "আমি তো তোমাকে কখনো এমন কিছু করিনি, যাতে তুমি আমাকে সন্দেহ করো।"


সামির চুপ ছিল।


আজ এতদিন পর সে স্বীকার করে, সেদিন তার চুপ করে থাকাটাও ছিল এক ধরনের অন্যায়।


তারপর শুরু হলো অভিমান।


কথা কমে গেল।


হাসি কমে গেল।


কিন্তু ভালোবাসা কমল না।


বরং অদ্ভুতভাবে আরও বেড়ে গেল।


একদিন রাগের মাথায় সামির তাকে ব্লক করে দিল।


ব্লক করার পর প্রথম কয়েক মিনিট তার মনে হয়েছিল, সে হয়তো ঠিক কাজটাই করেছে।


তারপর এক ঘণ্টা কেটে গেল।


দুই ঘণ্টা।


রাত হয়ে গেল।


সে বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিল।


তারপর মনে পড়ল, সে নিজেই তো সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।


সেদিন রাতটা খুব দীর্ঘ ছিল।


ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছিল, কিন্তু সময় যেন থেমে ছিল।


পরদিন ফজরের নামাজ পড়ে সে অনেকক্ষণ সিজদায় ছিল।


তার দোয়া ছিল খুব ছোট।


"হে আল্লাহ, আমি যদি ভুল করে থাকি, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন।"


কিন্তু মানুষ সবসময় নিজের ভুল এত সহজে স্বীকার করতে পারে না।


তাই দিন কেটে গেল।


একদিন।


দুইদিন।


এক সপ্তাহ।


তারপর এক মাস।


তারপর দুই মাস।


দুই মাস।


মাত্র দুটি শব্দ।


কিন্তু যে অপেক্ষা করেছে, সে জানে এই দুটি শব্দের ভেতরে কত দীর্ঘ রাত, কত না বলা কথা আর কতটা নীরবতা লুকিয়ে থাকে।


সামির মাঝে মাঝে তাদের পুরোনো কথোপকথন পড়ত।


"আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।"


এই লাইনটা পড়ে সে অনেকবার কেঁদেছে।


সে ভাবত, "তাহলে এখন কীভাবে আছে?"


কিন্তু মানুষ অনেক কিছু ছাড়া থাকতে শিখে যায়।


শুধু কিছু মানুষ শেখে না।


সামির ছিল সেই মানুষদের একজন।


সে বহুবার ভেবেছে, আর মেসেজ করবে না।


তারপরও করেছে।


ভেবেছে, আর অপেক্ষা করবে না।


তারপরও করেছে।


ভেবেছে, এবার হয়তো ছেড়ে দেবে।


কিন্তু পারেনি।


কারণ কিছু মানুষকে ভালোবাসা কোনো সিদ্ধান্ত নয়; এটা অভ্যাস।


আর অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।


অনেকদিন পর একদিন আবার কথা হলো।


প্রথম দিকে কেউ কিছু বলছিল না।


দু'জনেই যেন শব্দ খুঁজছিল।


তারপর সাবিহা খুব আস্তে করে বলল,


— "তুমি কি এখনো রাগ করে আছো?"


সামিরের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।


সে বুঝল, কিছু মানুষকে হাজারবার হারিয়েও মানুষ আবার ফিরে পেতে চায়।


সেই রাতেই অনেক কথা হয়েছিল।


অনেক কান্না হয়েছিল।


আর সেই রাতেই প্রথমবার সাবিহা এমন একটি কথা বলেছিল, যেটা আজও সামিরের বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে।


— "আমার পরিবার কখনো মানবে না।"


সামির মনে করেছিল, কেউ যেন তার বুকের ওপর একটা পাথর রেখে দিয়েছে।


সে অনেকক্ষণ চুপ ছিল।


তারপর বলেছিল,


— "তুমি চেষ্টা করবে?"


— "ভয় লাগে।"


— "আর যদি আমি সারাজীবন অপেক্ষা করি?"


ওপাশে নীরবতা।


তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস।


— "তুমি আমাকে ভুলে যাও।"


মানুষের জীবনে কিছু বাক্য থাকে, যেগুলো শোনার পর সে আর আগের মানুষটা থাকে না।


"তুমি আমাকে ভুলে যাও"—এই পাঁচটি শব্দের পর সেদিন সামির আর কিছু বলতে পারেনি।


সে শুধু ফোনটা রেখে দিয়েছিল।


সেই রাতে সে ঘুমায়নি।


তাহাজ্জুদের সময় সে সিজদায় পড়ে কেঁদেছিল।


হয়তো জীবনে প্রথমবার এতটা।


সে শুধু একটি কথাই বারবার বলছিল—


"হে আল্লাহ, আমি তাকে চাই। খুব করে চাই। যদি সে আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে তাকে আমার করে দিন। আর যদি না হয়, তাহলে আমাকে এতটা ভালোবাসার ক্ষমতা কেন দিলেন?"


সেদিন তার কোনো উত্তর মেলেনি।


আজও মেলেনি।


শুধু এতটুকু বুঝেছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় মানুষটি সেই, যে কাউকে খুব বেশি ভালোবাসে, কিন্তু তাকে নিজের করে পাওয়ার ক্ষমতা তার হাতে নেই।


আর সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল।


কারণ সে এখনো বিশ্বাস করত—


একদিন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।


একদিন হয়তো ময়না ফিরে এসে বলবে,


"দেখো, আমি এসেছি। এতদিন কোথায় ছিলে?"

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - দ্বিতীয় খণ্ড


 সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(দ্বিতীয় খণ্ড: ময়না, কিছু স্বপ্ন এবং দীর্ঘ রাতের গল্প)


সময় অদ্ভুতভাবে মানুষের জীবনে কাজ করে।


কখনো কয়েক বছর এক মুহূর্তের মতো কেটে যায়, আবার কখনো একটি রাতও মনে হয় অনন্তকাল। সামিরের কাছে সেই সময়টা ছিল ঠিক এমনই—প্রতিটি দিন যেন নতুন কোনো অনুভূতি নিয়ে আসত।


"ময়না" নামটি দেওয়ার পর থেকে সাবিহা মাঝে মাঝে হেসে বলত,


— "আপনি না, একদম অদ্ভুত!"


সামির জিজ্ঞেস করত, "কেন?"


— "মানুষের এত নাম থাকতে ময়না?"


সামির কখনো উত্তর দিতে পারত না। কিছু প্রশ্নের উত্তর আসলে ভাষায় দেওয়া যায় না। হয়তো সে নিজেও জানত না কেন এই নাম। শুধু মনে হতো, এই নামের মধ্যে এক ধরনের মায়া আছে। আর সেই মায়াটা মেয়েটির সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে যায়।


এরপর থেকে দিনগুলো অন্যরকম হতে শুরু করল।


প্রথম দিকে পড়াশোনা নিয়ে কথা হতো। তারপর সেই কথাগুলো ধীরে ধীরে জীবন নিয়ে হয়ে গেল। কে কী খেতে পছন্দ করে, কার কোন বিষয় ভালো লাগে, কার কোন বিষয় অপছন্দ—এসব ছোট ছোট বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।


সামির বুঝতে পারছিল, সে ধীরে ধীরে এমন একজন মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যাকে সে এখনো নিজের বলতে পারে না।


রাত বাড়লে তাদের কথাও বাড়ত।


কখনো রাত বারোটা।


কখনো একটা।


কখনো বা ফজরের আজান পর্যন্ত।


একসময় সামির খেয়াল করল, তার দিনের শুরু আর শেষ—দুটোই যেন একজন মানুষকে ঘিরে।


এক রাতে সাবিহা হঠাৎ বলেছিল,


— "একটা কথা বলি?"


— "হুম, বলো।"


— "যদি কোনোদিন আমার পরিবার রাজি না হয়?"


প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু সামিরের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল।


সে একটু চুপ থেকে বলেছিল,


— "আমি অপেক্ষা করব।"


— "কতদিন?"


— "যতদিন আল্লাহ চান।"


ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল।


তারপর খুব আস্তে করে সাবিহা বলেছিল,


— "মানুষ এত অপেক্ষা করতে পারে?"


সামির সেদিন উত্তর দেয়নি।


কারণ সে জানত না, মানুষ সত্যিই কতদিন অপেক্ষা করতে পারে। সে শুধু জানত, সে চেষ্টা করবে।


এর কিছুদিন পর এক রাতে সাহস করে সে নিজের মনের কথা বলে ফেলেছিল।


"আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, ময়না।"


মেসেজটি পাঠানোর পর তার হাত কাঁপছিল। কয়েক মিনিট কোনো উত্তর এল না।


সেই কয়েক মিনিট যেন কয়েক বছরের মতো লাগছিল।


অবশেষে উত্তর এলো।


"আমি জানতাম।"


সামির অবাক হয়ে লিখল, "কীভাবে?"


"জানি না। কিছু কিছু বিষয় বুঝে নিতে হয়।"


সেই রাতে খুব বেশি কথা হয়নি। কিন্তু সামির বুঝেছিল, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোর একটি সে বলে ফেলেছে।


তারপর শুরু হলো স্বপ্ন দেখা।


খুব বড় কোনো স্বপ্ন নয়।


একটি ছোট সংসার।


একসঙ্গে বসে চা খাওয়া।


সন্ধ্যায় কোথাও হাঁটতে যাওয়া।


আর মাঝেমধ্যে সূরা রহমান শোনা।


সামির কখনো কখনো মজা করে বলত,


— "একদিন যদি আমাদের বিয়ে হয়, তাহলে কিন্তু তোমাকে প্রতিদিন সূরা রহমান শুনতে হবে।"


সাবিহা হাসত।


তার হাসিটা দেখা যেত না, কিন্তু অনুভব করা যেত।


একদিন হঠাৎ সে বলেছিল,


— "শোনো, একটা কথা মনে রাখবে।"


— "কী?"


— "যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তাহলে নিজেকে কষ্ট দিও না।"


সামির একটু রাগ করেই বলেছিল,


— "এই কথাগুলো আর কখনো বলবে না।"


— "কিন্তু জীবন তো সবসময় আমাদের মতো চলে না।"


সেদিন কথাটা শুনে সামির বিরক্ত হয়েছিল।


আজ এতদিন পর সে বুঝতে পারে, মেয়েটি হয়তো তখন থেকেই ভয় পেতে শুরু করেছিল।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো।


তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত।


কখনো হাসত।


কখনো তর্ক করত।


কখনো কোনো কারণ ছাড়াই চুপ করে থাকত।


একদিন গভীর রাতে সাবিহা বলেছিল,


— "একটা কথা বলব, রাগ করবে না তো?"


— "না।"


— "আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।"


সামির অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিতে পারেনি।


জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষের কাছে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা ছোট হয়ে যায়।


সে শুধু লিখেছিল,


— "তাহলে কখনো চলে যেও না।"


উত্তরে সাবিহা লিখেছিল,


— "বিয়ের আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে কথা বলবে তো?"


সামির সেদিন মনে মনে হেসেছিল।


সে ভেবেছিল, "বিয়ের আগে পর্যন্ত কেন? আমি তো সারাজীবন কথা বলতে চাই।"


কিন্তু মানুষের জীবন তার ইচ্ছেমতো চলে না।


এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভঙ্গুর জিনিস বোধহয় মানুষের পরিকল্পনা।


ধীরে ধীরে সামির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করল।


সে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কথা ভাবল।


সে নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়ার কথা ভাবল।


কারণ সে জানত, ভালোবাসা শুধু অনুভূতির নাম নয়; ভালোবাসা দায়িত্বেরও নাম।


সে একদিন আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে বলেছিল,


"হে আল্লাহ, আমি জানি না আমার জন্য কী ভালো। কিন্তু আমি এটুকু জানি, আমি এই মানুষটিকে খুব ভালোবাসি। যদি সে আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত বাধা সহজ করে দিন।"


সেদিন তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে তার চোখ ভিজে গিয়েছিল।


সে বুঝতে পারেনি, এটি আনন্দের কান্না ছিল, নাকি ভয়ের।


কারণ তার বুকের ভেতর তখন একটি অদ্ভুত আশঙ্কা জন্ম নিতে শুরু করেছে।


সে ভয় পেতে শুরু করেছে।


মানুষ যখন কাউকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলে, তখন সে তাকে হারানোর ভয়ও পেতে শুরু করে।


আর সেই ভয়ই একদিন ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়।


সামির তখনো জানত না, খুব শীঘ্রই তার জীবনে এমন এক ঝড় আসতে চলেছে, যা তাদের দু'জনকেই বদলে দেবে।


আর সেই ঝড়ের নাম ছিল—


সন্দেহ।

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - প্রথম খন্ড


 সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(প্রথম খণ্ড: প্রথম দেখা)


মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যেগুলোর শুরুটা এতটাই সাধারণ হয় যে, কেউ কল্পনাও করতে পারে না সেগুলো একদিন বুকের ভেতর স্থায়ী ব্যথা হয়ে থেকে যাবে।


এই গল্পটাও তেমনই।


২০২৪ সালের কথা। দিন-তারিখ আজ আর সামিরের মনে নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য কখনো মুছে যায় না। মানুষের স্মৃতি বড় অদ্ভুত—হাজারটা মুখ ভুলে যায়, অথচ একটি মুখ বছরের পর বছর ধরে আগের মতোই স্পষ্ট থেকে যায়।


সামির তখন নিজের জীবন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। পড়াশোনা, কাজ, ভবিষ্যতের চিন্তা—সব মিলিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। সে কখনো ভাবেনি, তার জীবনে এমন একজন আসবে, যার জন্য একদিন তাহাজ্জুদের সিজদায় চোখের পানি ফেলতে হবে।


কোচিং সেন্টারের দিনগুলো অন্য দিনের মতোই ছিল। ছাত্রছাত্রীরা আসত, ক্লাস করত, চলে যেত। সেই ভিড়ের মাঝেই একদিন একটি মেয়ে এসে পড়াশোনার বিষয়ে কিছু জানতে চেয়েছিল।


প্রথম আলাপ।


কোনো নাটকীয়তা ছিল না, কোনো বিশেষ অনুভূতিও ছিল না।


— "স্যার, এটা কীভাবে পড়ব?"


সামির উত্তর দিয়েছিল।


তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।


মেয়েটির নাম ছিল সাবিহা।


তার কণ্ঠটা ছিল নরম, কথাগুলো ছিল পরিপাটি। প্রথম দিন দেখে সামির কিছুই ভাবেনি। কিন্তু মানুষ বোধহয় প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলে না; ভালোবাসা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে জন্ম নেয়।


তারপর থেকে মাঝেমধ্যে পড়াশোনা নিয়ে কথা হতো।


"আজ পড়া শেষ হয়েছে?"


"পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?"


"এই অংশটা বুঝতে পেরেছ?"


ছোট ছোট কথাগুলো কখন যে বড় হয়ে উঠেছিল, সেটা তাদের কেউই বুঝতে পারেনি।


সামির মাঝে মাঝে খেয়াল করত, মেয়েটা খুব মিষ্টি করে কথা বলে। তার কথার ভেতরে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল। এমন নয় যে সে খুব বেশি কথা বলত; বরং অল্প কথাতেই অনেক কিছু বলে দিতে পারত।


কিন্তু তখনো সামির জানত না, একদিন এই কণ্ঠই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠবে।


এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করে সে সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেখল।


সাবিহা কোরআন তেলাওয়াত করছিল।


সামির থেমে গেল।


সে আবার শুনল।


তারপর আরও একবার।


অনেক মানুষ সুন্দর কথা বলতে পারে, কিন্তু সবাই সুন্দর করে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে না। সেই তেলাওয়াতের মধ্যে একটা প্রশান্তি ছিল, একটা পবিত্রতা ছিল, যেটা সামিরের বুকের ভেতর অদ্ভুতভাবে গিয়ে লাগল।


সেদিন প্রথমবার তার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা অন্যরকম।


অনেকক্ষণ দ্বিধায় থাকার পর সে একটি ছোট্ট মেসেজ পাঠাল—


"তুমি কি আমার জন্য সূরা রহমান তেলাওয়াত করে পাঠাবে?"


মেসেজ পাঠানোর পর তার নিজেরই অস্বস্তি হচ্ছিল। যদি মেয়েটা কিছু মনে করে? যদি না বলে?


কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর তার ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ এসে পৌঁছাল।


সামির আজও সেই রাতটার কথা ভুলতে পারেনি।


ঘরের সব আলো নিভিয়ে, পৃথিবীর সব শব্দ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে সে ভয়েস মেসেজটি চালু করেছিল।


তারপর ভেসে এসেছিল সেই কণ্ঠ।


"ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান..."


সামির জানত না, মানুষ একটি কণ্ঠের প্রেমেও পড়তে পারে।


সে জানত না, একটি সূরা একদিন তাকে এতটা অসহায় করে দেবে।


ভয়েস মেসেজটি শেষ হওয়ার পরও সে অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত শব্দের ভেতর সে আজ সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি শুনেছে।


সেদিন রাতে তার ঘুম হয়নি।


সে বারবার ভয়েস মেসেজটি শুনছিল।


একবার।


দুইবার।


দশবার।


কতবার শুনেছিল, সেটা আজ আর তার মনে নেই।


শুধু মনে আছে, সেদিন প্রথমবার সে আল্লাহর কাছে একটি অদ্ভুত দোয়া করেছিল।


"হে আল্লাহ, যদি এই মানুষটি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে একদিন তাকে আমার জীবনের অংশ করে দিন।"


তখনো সে জানত না, কিছু দোয়ার উত্তর পেতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়।


দিন যেতে লাগল।


কথা বাড়তে লাগল।


একসময় সামির তাকে একটি নামে ডাকতে শুরু করল।


"ময়না।"


প্রথমবার নামটি শুনে সাবিহা নীরব হয়ে গিয়েছিল।


— "এই নামে কেন ডাকছেন?"


সামির হেসে বলেছিল, "জানি না। মনে হয়, এই নামটা তোমার জন্যই তৈরি হয়েছে।"


তারপর থেকে সে আর শুধু সাবিহা রইল না।


সে হয়ে গেল—ময়না।


মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসতে শুরু করে, তখন তার জন্য আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি করে। সেই পৃথিবীতে আলাদা কিছু নাম থাকে, আলাদা কিছু স্মৃতি থাকে, আলাদা কিছু অনুভূতি থাকে।


সামিরের পৃথিবীতেও তখন ধীরে ধীরে একজন মানুষ জায়গা করে নিচ্ছিল।


রাত বাড়তে থাকত, আর তাদের কথাও বাড়তে থাকত।


কখনো পড়াশোনা নিয়ে।


কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে।


কখনো এমন সব বিষয় নিয়ে, যেগুলোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।


কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধহয় এটাই—দুইজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারে, অথচ তাদের কোনো বিষয়ের প্রয়োজন হয় না।


একদিন কথার মাঝেই সামির তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—


"যদি কোনোদিন আমি তোমাকে আমার জীবনের অংশ করতে চাই, তুমি কি রাজি হবে?"


প্রশ্নটা করার পর তার বুক কাঁপছিল।


ওপাশে অনেকক্ষণ নীরবতা ছিল।


তারপর খুব আস্তে একটি উত্তর এসেছিল—


"যদি আল্লাহ চান, তাহলে কেন নয়?"


সেদিন থেকে সামিরের পৃথিবী বদলে যেতে শুরু করল।


সে ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করল।


সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।


সে বিশ্বাস করতে শুরু করল, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।


কিন্তু সে জানত না, ভালোবাসার পথের সবচেয়ে কঠিন শত্রুর নাম—সময়।


আর সময়, মানুষের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নগুলোকে ভেঙে দিতে কখনো ক্লান্ত হয় না।


সামির আজও মাঝে মাঝে ভাবতে বসে, যদি সেদিন সে সূরা রহমানের সেই তেলাওয়াত না শুনত, তাহলে কি তার জীবনটা অন্যরকম হতো?


উত্তরটা সে আজও জানে না।


শুধু জানে, সেই রাতের পর থেকে পৃথিবীতে তার সবচেয়ে প্রিয় শব্দ হয়ে গিয়েছিল—


"ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান..."


আর সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল একটি নাম।


ময়না।


যে নামটি আজও তার প্রতিটি দোয়ার শেষে নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়।

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

  সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ (চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর) সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থা...