সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - তৃতীয় খণ্ড

 

সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(তৃতীয় খণ্ড: সন্দেহের ঋতু)


মানুষ যখন খুব বেশি ভালোবেসে ফেলে, তখন তার ভেতরে দু'টি জিনিস জন্ম নেয়—ভয় এবং অধিকারবোধ।


ভালোবাসার শুরুতে মানুষ শুধু হাসতে শেখে। কিন্তু ভালোবাসা যত গভীর হয়, ততই সে হারানোর ভয় পেতে শুরু করে। আর এই ভয়টাই একসময় সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেও অপরিচিত করে দিতে পারে।


সামিরের ক্ষেত্রেও হয়েছিল ঠিক তাই।


যে মানুষটা একদিন সূরা রহমানের তেলাওয়াতে তার রাতগুলোকে সুন্দর করে তুলেছিল, সেই মানুষটিকে হারানোর ভয় ধীরে ধীরে তাকে বদলে দিতে শুরু করল।


শুরুর দিকে বিষয়গুলো খুব ছোট ছিল।


"আজ এত দেরি করে উত্তর দিলে কেন?"


"তুমি কি ব্যস্ত ছিলে?"


"তোমার মন খারাপ?"


এই প্রশ্নগুলো একসময় বদলে গেল।


"কার সঙ্গে কথা বলছিলে?"


"আমাকে কিছু লুকাচ্ছো না তো?"


"তুমি কি আগের মতো আছো?"


সাবিহা প্রথমে বুঝতে পারত না।


সে অবাক হয়ে বলত, "তুমি এত ভাবো কেন?"


সামির উত্তর দিত না।


সে কীভাবে বোঝাবে, যে মানুষটাকে সে নিজের প্রতিটি দোয়ার শেষে চায়, তাকে হারানোর চিন্তাটাই তার সবচেয়ে বড় ভয়?


কিন্তু ভয় কখনো কখনো মানুষের বিচারবুদ্ধির চেয়েও বড় হয়ে যায়।


একদিন রাত প্রায় দু'টো।


অনেকক্ষণ ধরে তাদের কথা হচ্ছিল না।


সামিরের মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বদলে গেছে।


মানুষের মন বড় অদ্ভুত। কোনো প্রমাণ ছাড়াই সে হাজারটা গল্প তৈরি করে ফেলতে পারে।


সেই রাতে সামির এমন কিছু কথা বলেছিল, যেগুলো তার বলা উচিত ছিল না।


সাবিহা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।


তারপর খুব শান্ত গলায় বলেছিল,


— "তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?"


সামির উত্তর দিতে পারেনি।


কারণ সত্যিটা ছিল, সে বিশ্বাস করত। কিন্তু সে ভয়ও পেত।


আর ভালোবাসার ভেতর যখন ভয় ঢুকে পড়ে, তখন বিশ্বাসও ধীরে ধীরে আহত হতে শুরু করে।


সেই রাতেই প্রথম বড় ঝগড়া হয়েছিল।


সাবিহা শুধু একটি কথাই বারবার বলছিল,


— "আমি তো তোমাকে কখনো এমন কিছু করিনি, যাতে তুমি আমাকে সন্দেহ করো।"


সামির চুপ ছিল।


আজ এতদিন পর সে স্বীকার করে, সেদিন তার চুপ করে থাকাটাও ছিল এক ধরনের অন্যায়।


তারপর শুরু হলো অভিমান।


কথা কমে গেল।


হাসি কমে গেল।


কিন্তু ভালোবাসা কমল না।


বরং অদ্ভুতভাবে আরও বেড়ে গেল।


একদিন রাগের মাথায় সামির তাকে ব্লক করে দিল।


ব্লক করার পর প্রথম কয়েক মিনিট তার মনে হয়েছিল, সে হয়তো ঠিক কাজটাই করেছে।


তারপর এক ঘণ্টা কেটে গেল।


দুই ঘণ্টা।


রাত হয়ে গেল।


সে বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিল।


তারপর মনে পড়ল, সে নিজেই তো সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।


সেদিন রাতটা খুব দীর্ঘ ছিল।


ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছিল, কিন্তু সময় যেন থেমে ছিল।


পরদিন ফজরের নামাজ পড়ে সে অনেকক্ষণ সিজদায় ছিল।


তার দোয়া ছিল খুব ছোট।


"হে আল্লাহ, আমি যদি ভুল করে থাকি, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন।"


কিন্তু মানুষ সবসময় নিজের ভুল এত সহজে স্বীকার করতে পারে না।


তাই দিন কেটে গেল।


একদিন।


দুইদিন।


এক সপ্তাহ।


তারপর এক মাস।


তারপর দুই মাস।


দুই মাস।


মাত্র দুটি শব্দ।


কিন্তু যে অপেক্ষা করেছে, সে জানে এই দুটি শব্দের ভেতরে কত দীর্ঘ রাত, কত না বলা কথা আর কতটা নীরবতা লুকিয়ে থাকে।


সামির মাঝে মাঝে তাদের পুরোনো কথোপকথন পড়ত।


"আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।"


এই লাইনটা পড়ে সে অনেকবার কেঁদেছে।


সে ভাবত, "তাহলে এখন কীভাবে আছে?"


কিন্তু মানুষ অনেক কিছু ছাড়া থাকতে শিখে যায়।


শুধু কিছু মানুষ শেখে না।


সামির ছিল সেই মানুষদের একজন।


সে বহুবার ভেবেছে, আর মেসেজ করবে না।


তারপরও করেছে।


ভেবেছে, আর অপেক্ষা করবে না।


তারপরও করেছে।


ভেবেছে, এবার হয়তো ছেড়ে দেবে।


কিন্তু পারেনি।


কারণ কিছু মানুষকে ভালোবাসা কোনো সিদ্ধান্ত নয়; এটা অভ্যাস।


আর অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।


অনেকদিন পর একদিন আবার কথা হলো।


প্রথম দিকে কেউ কিছু বলছিল না।


দু'জনেই যেন শব্দ খুঁজছিল।


তারপর সাবিহা খুব আস্তে করে বলল,


— "তুমি কি এখনো রাগ করে আছো?"


সামিরের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।


সে বুঝল, কিছু মানুষকে হাজারবার হারিয়েও মানুষ আবার ফিরে পেতে চায়।


সেই রাতেই অনেক কথা হয়েছিল।


অনেক কান্না হয়েছিল।


আর সেই রাতেই প্রথমবার সাবিহা এমন একটি কথা বলেছিল, যেটা আজও সামিরের বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে।


— "আমার পরিবার কখনো মানবে না।"


সামির মনে করেছিল, কেউ যেন তার বুকের ওপর একটা পাথর রেখে দিয়েছে।


সে অনেকক্ষণ চুপ ছিল।


তারপর বলেছিল,


— "তুমি চেষ্টা করবে?"


— "ভয় লাগে।"


— "আর যদি আমি সারাজীবন অপেক্ষা করি?"


ওপাশে নীরবতা।


তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস।


— "তুমি আমাকে ভুলে যাও।"


মানুষের জীবনে কিছু বাক্য থাকে, যেগুলো শোনার পর সে আর আগের মানুষটা থাকে না।


"তুমি আমাকে ভুলে যাও"—এই পাঁচটি শব্দের পর সেদিন সামির আর কিছু বলতে পারেনি।


সে শুধু ফোনটা রেখে দিয়েছিল।


সেই রাতে সে ঘুমায়নি।


তাহাজ্জুদের সময় সে সিজদায় পড়ে কেঁদেছিল।


হয়তো জীবনে প্রথমবার এতটা।


সে শুধু একটি কথাই বারবার বলছিল—


"হে আল্লাহ, আমি তাকে চাই। খুব করে চাই। যদি সে আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে তাকে আমার করে দিন। আর যদি না হয়, তাহলে আমাকে এতটা ভালোবাসার ক্ষমতা কেন দিলেন?"


সেদিন তার কোনো উত্তর মেলেনি।


আজও মেলেনি।


শুধু এতটুকু বুঝেছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় মানুষটি সেই, যে কাউকে খুব বেশি ভালোবাসে, কিন্তু তাকে নিজের করে পাওয়ার ক্ষমতা তার হাতে নেই।


আর সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল।


কারণ সে এখনো বিশ্বাস করত—


একদিন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।


একদিন হয়তো ময়না ফিরে এসে বলবে,


"দেখো, আমি এসেছি। এতদিন কোথায় ছিলে?"

No comments:

Post a Comment

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

  সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ (চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর) সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থা...