সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - প্রথম খন্ড


 সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(প্রথম খণ্ড: প্রথম দেখা)


মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যেগুলোর শুরুটা এতটাই সাধারণ হয় যে, কেউ কল্পনাও করতে পারে না সেগুলো একদিন বুকের ভেতর স্থায়ী ব্যথা হয়ে থেকে যাবে।


এই গল্পটাও তেমনই।


২০২৪ সালের কথা। দিন-তারিখ আজ আর সামিরের মনে নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য কখনো মুছে যায় না। মানুষের স্মৃতি বড় অদ্ভুত—হাজারটা মুখ ভুলে যায়, অথচ একটি মুখ বছরের পর বছর ধরে আগের মতোই স্পষ্ট থেকে যায়।


সামির তখন নিজের জীবন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। পড়াশোনা, কাজ, ভবিষ্যতের চিন্তা—সব মিলিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। সে কখনো ভাবেনি, তার জীবনে এমন একজন আসবে, যার জন্য একদিন তাহাজ্জুদের সিজদায় চোখের পানি ফেলতে হবে।


কোচিং সেন্টারের দিনগুলো অন্য দিনের মতোই ছিল। ছাত্রছাত্রীরা আসত, ক্লাস করত, চলে যেত। সেই ভিড়ের মাঝেই একদিন একটি মেয়ে এসে পড়াশোনার বিষয়ে কিছু জানতে চেয়েছিল।


প্রথম আলাপ।


কোনো নাটকীয়তা ছিল না, কোনো বিশেষ অনুভূতিও ছিল না।


— "স্যার, এটা কীভাবে পড়ব?"


সামির উত্তর দিয়েছিল।


তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।


মেয়েটির নাম ছিল সাবিহা।


তার কণ্ঠটা ছিল নরম, কথাগুলো ছিল পরিপাটি। প্রথম দিন দেখে সামির কিছুই ভাবেনি। কিন্তু মানুষ বোধহয় প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলে না; ভালোবাসা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে জন্ম নেয়।


তারপর থেকে মাঝেমধ্যে পড়াশোনা নিয়ে কথা হতো।


"আজ পড়া শেষ হয়েছে?"


"পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?"


"এই অংশটা বুঝতে পেরেছ?"


ছোট ছোট কথাগুলো কখন যে বড় হয়ে উঠেছিল, সেটা তাদের কেউই বুঝতে পারেনি।


সামির মাঝে মাঝে খেয়াল করত, মেয়েটা খুব মিষ্টি করে কথা বলে। তার কথার ভেতরে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল। এমন নয় যে সে খুব বেশি কথা বলত; বরং অল্প কথাতেই অনেক কিছু বলে দিতে পারত।


কিন্তু তখনো সামির জানত না, একদিন এই কণ্ঠই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠবে।


এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করে সে সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেখল।


সাবিহা কোরআন তেলাওয়াত করছিল।


সামির থেমে গেল।


সে আবার শুনল।


তারপর আরও একবার।


অনেক মানুষ সুন্দর কথা বলতে পারে, কিন্তু সবাই সুন্দর করে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে না। সেই তেলাওয়াতের মধ্যে একটা প্রশান্তি ছিল, একটা পবিত্রতা ছিল, যেটা সামিরের বুকের ভেতর অদ্ভুতভাবে গিয়ে লাগল।


সেদিন প্রথমবার তার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা অন্যরকম।


অনেকক্ষণ দ্বিধায় থাকার পর সে একটি ছোট্ট মেসেজ পাঠাল—


"তুমি কি আমার জন্য সূরা রহমান তেলাওয়াত করে পাঠাবে?"


মেসেজ পাঠানোর পর তার নিজেরই অস্বস্তি হচ্ছিল। যদি মেয়েটা কিছু মনে করে? যদি না বলে?


কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর তার ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ এসে পৌঁছাল।


সামির আজও সেই রাতটার কথা ভুলতে পারেনি।


ঘরের সব আলো নিভিয়ে, পৃথিবীর সব শব্দ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে সে ভয়েস মেসেজটি চালু করেছিল।


তারপর ভেসে এসেছিল সেই কণ্ঠ।


"ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান..."


সামির জানত না, মানুষ একটি কণ্ঠের প্রেমেও পড়তে পারে।


সে জানত না, একটি সূরা একদিন তাকে এতটা অসহায় করে দেবে।


ভয়েস মেসেজটি শেষ হওয়ার পরও সে অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত শব্দের ভেতর সে আজ সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি শুনেছে।


সেদিন রাতে তার ঘুম হয়নি।


সে বারবার ভয়েস মেসেজটি শুনছিল।


একবার।


দুইবার।


দশবার।


কতবার শুনেছিল, সেটা আজ আর তার মনে নেই।


শুধু মনে আছে, সেদিন প্রথমবার সে আল্লাহর কাছে একটি অদ্ভুত দোয়া করেছিল।


"হে আল্লাহ, যদি এই মানুষটি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে একদিন তাকে আমার জীবনের অংশ করে দিন।"


তখনো সে জানত না, কিছু দোয়ার উত্তর পেতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়।


দিন যেতে লাগল।


কথা বাড়তে লাগল।


একসময় সামির তাকে একটি নামে ডাকতে শুরু করল।


"ময়না।"


প্রথমবার নামটি শুনে সাবিহা নীরব হয়ে গিয়েছিল।


— "এই নামে কেন ডাকছেন?"


সামির হেসে বলেছিল, "জানি না। মনে হয়, এই নামটা তোমার জন্যই তৈরি হয়েছে।"


তারপর থেকে সে আর শুধু সাবিহা রইল না।


সে হয়ে গেল—ময়না।


মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসতে শুরু করে, তখন তার জন্য আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি করে। সেই পৃথিবীতে আলাদা কিছু নাম থাকে, আলাদা কিছু স্মৃতি থাকে, আলাদা কিছু অনুভূতি থাকে।


সামিরের পৃথিবীতেও তখন ধীরে ধীরে একজন মানুষ জায়গা করে নিচ্ছিল।


রাত বাড়তে থাকত, আর তাদের কথাও বাড়তে থাকত।


কখনো পড়াশোনা নিয়ে।


কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে।


কখনো এমন সব বিষয় নিয়ে, যেগুলোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।


কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধহয় এটাই—দুইজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারে, অথচ তাদের কোনো বিষয়ের প্রয়োজন হয় না।


একদিন কথার মাঝেই সামির তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—


"যদি কোনোদিন আমি তোমাকে আমার জীবনের অংশ করতে চাই, তুমি কি রাজি হবে?"


প্রশ্নটা করার পর তার বুক কাঁপছিল।


ওপাশে অনেকক্ষণ নীরবতা ছিল।


তারপর খুব আস্তে একটি উত্তর এসেছিল—


"যদি আল্লাহ চান, তাহলে কেন নয়?"


সেদিন থেকে সামিরের পৃথিবী বদলে যেতে শুরু করল।


সে ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করল।


সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।


সে বিশ্বাস করতে শুরু করল, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।


কিন্তু সে জানত না, ভালোবাসার পথের সবচেয়ে কঠিন শত্রুর নাম—সময়।


আর সময়, মানুষের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নগুলোকে ভেঙে দিতে কখনো ক্লান্ত হয় না।


সামির আজও মাঝে মাঝে ভাবতে বসে, যদি সেদিন সে সূরা রহমানের সেই তেলাওয়াত না শুনত, তাহলে কি তার জীবনটা অন্যরকম হতো?


উত্তরটা সে আজও জানে না।


শুধু জানে, সেই রাতের পর থেকে পৃথিবীতে তার সবচেয়ে প্রিয় শব্দ হয়ে গিয়েছিল—


"ফাবি আইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান..."


আর সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল একটি নাম।


ময়না।


যে নামটি আজও তার প্রতিটি দোয়ার শেষে নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়।

No comments:

Post a Comment

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

  সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ (চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর) সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থা...