সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - দ্বিতীয় খণ্ড


 সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ


(দ্বিতীয় খণ্ড: ময়না, কিছু স্বপ্ন এবং দীর্ঘ রাতের গল্প)


সময় অদ্ভুতভাবে মানুষের জীবনে কাজ করে।


কখনো কয়েক বছর এক মুহূর্তের মতো কেটে যায়, আবার কখনো একটি রাতও মনে হয় অনন্তকাল। সামিরের কাছে সেই সময়টা ছিল ঠিক এমনই—প্রতিটি দিন যেন নতুন কোনো অনুভূতি নিয়ে আসত।


"ময়না" নামটি দেওয়ার পর থেকে সাবিহা মাঝে মাঝে হেসে বলত,


— "আপনি না, একদম অদ্ভুত!"


সামির জিজ্ঞেস করত, "কেন?"


— "মানুষের এত নাম থাকতে ময়না?"


সামির কখনো উত্তর দিতে পারত না। কিছু প্রশ্নের উত্তর আসলে ভাষায় দেওয়া যায় না। হয়তো সে নিজেও জানত না কেন এই নাম। শুধু মনে হতো, এই নামের মধ্যে এক ধরনের মায়া আছে। আর সেই মায়াটা মেয়েটির সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে যায়।


এরপর থেকে দিনগুলো অন্যরকম হতে শুরু করল।


প্রথম দিকে পড়াশোনা নিয়ে কথা হতো। তারপর সেই কথাগুলো ধীরে ধীরে জীবন নিয়ে হয়ে গেল। কে কী খেতে পছন্দ করে, কার কোন বিষয় ভালো লাগে, কার কোন বিষয় অপছন্দ—এসব ছোট ছোট বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।


সামির বুঝতে পারছিল, সে ধীরে ধীরে এমন একজন মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যাকে সে এখনো নিজের বলতে পারে না।


রাত বাড়লে তাদের কথাও বাড়ত।


কখনো রাত বারোটা।


কখনো একটা।


কখনো বা ফজরের আজান পর্যন্ত।


একসময় সামির খেয়াল করল, তার দিনের শুরু আর শেষ—দুটোই যেন একজন মানুষকে ঘিরে।


এক রাতে সাবিহা হঠাৎ বলেছিল,


— "একটা কথা বলি?"


— "হুম, বলো।"


— "যদি কোনোদিন আমার পরিবার রাজি না হয়?"


প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু সামিরের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল।


সে একটু চুপ থেকে বলেছিল,


— "আমি অপেক্ষা করব।"


— "কতদিন?"


— "যতদিন আল্লাহ চান।"


ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল।


তারপর খুব আস্তে করে সাবিহা বলেছিল,


— "মানুষ এত অপেক্ষা করতে পারে?"


সামির সেদিন উত্তর দেয়নি।


কারণ সে জানত না, মানুষ সত্যিই কতদিন অপেক্ষা করতে পারে। সে শুধু জানত, সে চেষ্টা করবে।


এর কিছুদিন পর এক রাতে সাহস করে সে নিজের মনের কথা বলে ফেলেছিল।


"আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, ময়না।"


মেসেজটি পাঠানোর পর তার হাত কাঁপছিল। কয়েক মিনিট কোনো উত্তর এল না।


সেই কয়েক মিনিট যেন কয়েক বছরের মতো লাগছিল।


অবশেষে উত্তর এলো।


"আমি জানতাম।"


সামির অবাক হয়ে লিখল, "কীভাবে?"


"জানি না। কিছু কিছু বিষয় বুঝে নিতে হয়।"


সেই রাতে খুব বেশি কথা হয়নি। কিন্তু সামির বুঝেছিল, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোর একটি সে বলে ফেলেছে।


তারপর শুরু হলো স্বপ্ন দেখা।


খুব বড় কোনো স্বপ্ন নয়।


একটি ছোট সংসার।


একসঙ্গে বসে চা খাওয়া।


সন্ধ্যায় কোথাও হাঁটতে যাওয়া।


আর মাঝেমধ্যে সূরা রহমান শোনা।


সামির কখনো কখনো মজা করে বলত,


— "একদিন যদি আমাদের বিয়ে হয়, তাহলে কিন্তু তোমাকে প্রতিদিন সূরা রহমান শুনতে হবে।"


সাবিহা হাসত।


তার হাসিটা দেখা যেত না, কিন্তু অনুভব করা যেত।


একদিন হঠাৎ সে বলেছিল,


— "শোনো, একটা কথা মনে রাখবে।"


— "কী?"


— "যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তাহলে নিজেকে কষ্ট দিও না।"


সামির একটু রাগ করেই বলেছিল,


— "এই কথাগুলো আর কখনো বলবে না।"


— "কিন্তু জীবন তো সবসময় আমাদের মতো চলে না।"


সেদিন কথাটা শুনে সামির বিরক্ত হয়েছিল।


আজ এতদিন পর সে বুঝতে পারে, মেয়েটি হয়তো তখন থেকেই ভয় পেতে শুরু করেছিল।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো।


তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত।


কখনো হাসত।


কখনো তর্ক করত।


কখনো কোনো কারণ ছাড়াই চুপ করে থাকত।


একদিন গভীর রাতে সাবিহা বলেছিল,


— "একটা কথা বলব, রাগ করবে না তো?"


— "না।"


— "আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।"


সামির অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিতে পারেনি।


জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষের কাছে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা ছোট হয়ে যায়।


সে শুধু লিখেছিল,


— "তাহলে কখনো চলে যেও না।"


উত্তরে সাবিহা লিখেছিল,


— "বিয়ের আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে কথা বলবে তো?"


সামির সেদিন মনে মনে হেসেছিল।


সে ভেবেছিল, "বিয়ের আগে পর্যন্ত কেন? আমি তো সারাজীবন কথা বলতে চাই।"


কিন্তু মানুষের জীবন তার ইচ্ছেমতো চলে না।


এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভঙ্গুর জিনিস বোধহয় মানুষের পরিকল্পনা।


ধীরে ধীরে সামির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করল।


সে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কথা ভাবল।


সে নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়ার কথা ভাবল।


কারণ সে জানত, ভালোবাসা শুধু অনুভূতির নাম নয়; ভালোবাসা দায়িত্বেরও নাম।


সে একদিন আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে বলেছিল,


"হে আল্লাহ, আমি জানি না আমার জন্য কী ভালো। কিন্তু আমি এটুকু জানি, আমি এই মানুষটিকে খুব ভালোবাসি। যদি সে আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত বাধা সহজ করে দিন।"


সেদিন তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে তার চোখ ভিজে গিয়েছিল।


সে বুঝতে পারেনি, এটি আনন্দের কান্না ছিল, নাকি ভয়ের।


কারণ তার বুকের ভেতর তখন একটি অদ্ভুত আশঙ্কা জন্ম নিতে শুরু করেছে।


সে ভয় পেতে শুরু করেছে।


মানুষ যখন কাউকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলে, তখন সে তাকে হারানোর ভয়ও পেতে শুরু করে।


আর সেই ভয়ই একদিন ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়।


সামির তখনো জানত না, খুব শীঘ্রই তার জীবনে এমন এক ঝড় আসতে চলেছে, যা তাদের দু'জনকেই বদলে দেবে।


আর সেই ঝড়ের নাম ছিল—


সন্দেহ।

No comments:

Post a Comment

সূরা রহমানের সেই কন্ঠ - চতুর্থ খণ্ড

  সূরা রহমানের সেই কণ্ঠ (চতুর্থ খণ্ড: হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ভেতর) সামির তখন ধীরে ধীরে সেই মানুষটিতে পরিণত হচ্ছিল, যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থা...